Vocational training institute principal Md. Ziaur Rahman and four trainees, including a female trainee in the foreground, wear hard hats and safety gloves and look at an electrical installation with two lit lightbulbs.

ILO Voices | সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ

দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা হোক সবার জন্য

বাংলাদেশের একটি কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. জিয়াউর রহমান, যেখানে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক নারী অপ্রচলিত পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। আইএলও-সমর্থিত উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি আরও নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছেন।

২২ জুন ২০২৬

Vocational training institute principal Md. Ziaur Rahman and four trainees look at an electrical installation. (Bangladesh, 2026) © Ariful Islam/ILO
Content also available in: English español français

আমার নাম মো. জিয়াউর রহমান। আমি বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) খাতে কাজ করি। শিক্ষার পরিবেশে নিজেকে অনিরাপদ মনে হওয়ার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। তাই আমার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে উঠেছি। আমার বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। তাঁর বদলিজনিত কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে।

আমার জীবনের একটি ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে - স্কুলে প্রথম দিন। আমার চেয়ে শারীরিকভাবে বড় ও শক্তিশালী এক সহপাঠী আমাকে হয়রানি করেছিল। সেই ঘটনার পর আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্কুলে যেতে চাইতাম না। পরিবারের দীর্ঘদিনের পরামর্শ ও উৎসাহের ফলে আমি আবার স্কুলে ফিরতে পেরেছিলাম। ঘটনাটি আমার জীবনে গভীরছাপ রেখে গেছে।

স্কুলে প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতা আজও আমার মনে গেঁথে আছে। শারীরিকভাবে একজন বড় ও শক্তিশালী সহপাঠীর হয়রানির কারণে আমি দীর্ঘদিন স্কুলে যেতে ভয় পেতাম।

মো. জিয়াউর রহমান, অধ্যক্ষ, টিটিসি খুলনা

আমি রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছি। পরে পরিবেশ বিজ্ঞানও তড়িৎ প্রকৌশলে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি।

১৯৯৯ সালে আমি কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে কর্মজীবন শুরু করি।

আমাকে অনুপ্রাণিত করে এই খাতের সম্ভাবনা। আমাদের রয়েছে দক্ষ প্রকৌশলী, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো। সরকারের সহায়তা, বিভিন্ন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (ILO)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছি।

Md. Ziaur Rahman stands in the middle with other students and teachers at his training institute. They are outside in a large grass-covered courtyard.  The institute building is in the background.
© Ariful Islam/ILO
© Ariful Islam/ILO
খুলনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে আমরা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। যখন সাবেক শিক্ষার্থীরা বিদেশ থেকে বা তাদের কর্মস্থল থেকে ফোন করে, তখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করি। (বাংলাদেশ, ২০২৬)

কর্মজীবনের শুরুতে আমি একটি পাঁচ তারকা হোটেলে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখান থেকেই জেন্ডার সমতা সম্পর্কে আমার উপলব্ধি গড়ে ওঠে।

হোটেলে কাজ করার সময় আমি দেখেছি নারী ও পুরুষেরমধ্যে কোনো বৈষম্য নেই। উভয়েই সমানভাবে অবদান রাখছেন এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমি নারীদের আরও ভালো পারফর্ম করতে দেখেছি।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

Md. Ziaur Rahman points to an electrical installation board during a practical training session. Two female and two male trainees look on. All are wearing hard hats.
© Ariful Islam/ILO
© Ariful Islam/ILO
বর্তমানে আমাদের অনেক নারী শিক্ষার্থী বৈদ্যুতিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন এবং দেশে-বিদেশে সফলভাবে কাজ করছেন। (বাংলাদেশ, ২০২৬)

২০২৪ সালে আমি খুলনা টিটিসির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমরা একটি জেন্ডার-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হই। তখন বুঝতে পারি, একা একজন অধ্যক্ষ হিসেবে এসব বিষয় কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

আমি প্রতিষ্ঠানে সমানুপাতিকভাবে নারী-পুরুষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম। আগে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম ছিলনা, তাই আমাদের সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।

শুরুতে যখন আমরা অভিভাবকদের সঙ্গে জেন্ডার সমতা নিয়ে আলোচনা করতাম, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিতেন না। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ ইতিবাচক সাড়া দিতেন।

তবুও আমি বিশ্বাস করতাম, আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে আমরা এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারব এবং নারীদের প্লাম্বিং, বৈদ্যুতিক কাজসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত দক্ষতা উন্নয়ন খাতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে পারব।

এসব পেশার শ্রমবাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং নারীদের সফলহওয়ার জন্যও এগুলো বড় সুযোগ তৈরি করে।

Md. Ziaur Rahman speaks to trainees and parents who are sat around a large, long table.
© Ariful Islam/ILO
© Ariful Islam/ILO
আমি প্রশিক্ষণার্থী, সম্ভাব্য শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের বোঝাই যে পেশা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে জেন্ডার কোনো বিষয় হওয়া উচিত নয়। (বাংলাদেশ, ২০২৬)

আইএলওর সঙ্গে আমার প্রথম কাজের সুযোগ আসে ProGRESS প্রকল্পের মাধ্যমে। সেখান থেকেই আমি জেন্ডার-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্তহই। পরে Skills 21 প্রকল্পের মাধ্যমে Talent Partnership উদ্যোগের সঙ্গেও আমাদের সংযোগ তৈরি হয়।

এটি অত্যন্ত ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ছিল। ProGRESS ও Talent Partnership প্রকল্প আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নতুন গতি এনেছে এবং নতুন নতুন কোর্স চালু করতে সহায়তা করেছে।

আমরা আগে থেকেই জেন্ডার সমতা নিয়ে কাজ করছিলাম, কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত। আইএলওর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে আমরা শিখেছি কীভাবে আরও সংগঠিতভাবে কাজকরতে হয় এবং এসব সমস্যা আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হয়।

আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। তারা জানে, এই প্রতিষ্ঠানে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কোনো স্থান নেই।

মো. জিয়াউর রহমান, অধ্যক্ষ, টিটিসি খুলনা

আমরানারী ও পুরুষ সহকর্মীদের নিয়ে একটি জেন্ডার কমিটি গঠন করেছি। প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা আলোচনা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টাকরি।

প্রতিটি ওরিয়েন্টেশন সেশনে আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সচেতনতাবৃদ্ধি করি। প্রথম দিনে নারী প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সাধারণত অভিভাবকেরা আসেন, এবং আমরা সেই সুযোগে তাদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করি।

আমরা তাদের জানাই যে এখানে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই এবং তাদের জন্য কী কী সুবিধা রয়েছে তাও ব্যাখ্যা করি।

Md. Ziaur Rahman and members of the training institute’s Gender Committee – three women and a man – stand next to a complaint and suggestion box. They look at a note on a piece of paper.
© Ariful Islam/ILO
© Ariful Islam/ILO
আইএলও র সহায়তায় টিটিসি খুলনায় একটি অভিযোগ ও পরামর্শ বাক্স, জেন্ডার কমিটি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যা সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। (বাংলাদেশ, ২০২৬)

সম্প্রতি আমাদের জাপানি ভাষা কোর্সের নয়জন তরুণ ও পাঁচজন তরুণীকে জাপানে চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল।

যখন জানতে পারলাম যে তরুণীদের জন্য থাকার ব্যবস্থা পৃথক ছিল না, যা যথেষ্ট নিরাপদ নয় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, তখন আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি।

রাতে আমি একজন নারী শিক্ষার্থীকে ফোন করে জানতে চাই, তারা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না। তার উত্তর আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

তিনি বলেছিলেন, তারা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে ঠিক ততটাই নিরাপদবোধ করছেন, যতটা নিজেদের পরিবারের ভাইদের সঙ্গে করেন।

তখন আমি উপলব্ধি করি যে প্রশিক্ষণকালীন সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা জেন্ডার বিভেদকে অতিক্রম করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম, প্রশিক্ষণের সময় আমাদের শিক্ষার্থীরা জেন্ডার বৈষম‌্যের ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরকে সম্মান করতে শিখেছে।

মো. জিয়াউর রহমান, অধ্যক্ষ, টিটিসি খুলনা

জেন্ডার বিষয়ক কাজ করতে গিয়ে আমিও ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তিত হয়েছি। আগে আমি কিছুটা কঠোর স্বভাবের ছিলাম এবং আমার কথাবার্তাও অনেক সময় রূঢ় শোনাত।

এখন আমি এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি, যা বিশেষকরে নারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। আমি এটিকে আমার জীবনের একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখি।

Md. Ziaur Rahman stands in front of a whiteboard displaying the words “Gender Equality”. He is speaking with a group of trainees holding signs and visual materials that explore different aspects of gender equality and inclusion.
© Ariful Islam/ILO
© Ariful Islam/ILO
প্রতিটি ওরিয়েন্টেশন সেশনে, আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে জেন্ডার সমতা বিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা শেয়ার করি। (বাংলাদেশ, ২০২৬)

একসময় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে কেবল পুরুষদের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন নারী ও পুরুষ উভয়েই সব ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

আমরা স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই মানসিকতা গড়ে তুলতে পেরেছি। তারা এখন কোনো বৈষম্য ছাড়াই একসঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।

যদি আমরা নারী-পুরুষের বিভেদভুলে, সবাইকে মানুষ হিসেবে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনতে পারি, তাহলে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নিজেদের সমানভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এভাবে সমাজের কেউ পিছিয়ে থাকবে না - আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারব।

সংক্ষিপ্ত তথ্য

  • ProGRESS (Promoting Gender Responsive Enterprise Development and TVET Systems) হলো গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে আইএলওর একটি প্রকল্প, যা বাংলাদেশে জেন্ডার সমতা, নিরাপদ শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দক্ষতা উন্নয়নকে এগিয়ে নিচ্ছে।
  • Skills 21 হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে আইএলওর একটি প্রকল্প, যা দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার মান ও প্রাসঙ্গিকতা বাড়াতে এবং তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
  • Supporting a Talent Partnership with Bangladesh প্রকল্পটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত, যার লক্ষ্য বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ তৈরি করা।
  • বিশ্বে প্রতি পাঁচজন কর্মরত মানুষের মধ্যে একজনেরও বেশি (২২.৮ শতাংশ বা ৭৪৩ মিলিয়ন মানুষ) কর্মজীবনে অন্তত একবার সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
  • আইএলওর সহায়তায় টিটিসি খুলনায় সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
  • আইএলও কনভেনশন ১৯০ (C190) হলো প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমমান, যা সহিংসতা ও হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশকে সবার অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  • প্রতি বছর ২১ জুন কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি বিষয়ক আইএলও কনভেনশন ১৯০ গৃহীত হওয়ার বার্ষিকী পালন করা হয়। এটি ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল।